ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্রপন্থার সমালোচনা করে ব্যক্তিগত ব্লগে লেখালেখি এবং ‘প্রেমের স্বাধীনতা’ নামে একটি বই প্রকাশের পর মামলার মুখে পড়েছেন ব্লগার ও লেখক মুহাম্মদ আবু সাঈদ। একই মামলায় আসামি করা হয়েছে বইটির প্রকাশক আরাফাত লাসিনকে। লেখকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলা দায়েরের তিন দিন পর প্রকাশককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
মুহাম্মদ আবু সাঈদের দাবি, ১৫ মার্চ ২০২৬ হেফাযতে ইসলামের নেতা আরিফুল ইসলাম ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এনে তার ও প্রকাশক আরাফাত লাসিনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। পরে ১৮ মার্চ আরাফাত লাসিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ব্লগের লেখাকে ঘিরে বিরোধ
নিজের ব্যক্তিগত ব্লগ abusayeed.net-এ ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্রবাদ, সমকামী মানুষের অধিকার, নারীর স্বাধীনতা এবং ধর্মের নামে সহিংসতার বিরুদ্ধে নিয়মিত লিখে আসছেন বলে জানিয়েছেন আবু সাঈদ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব লেখায় তিনি হেফাযতে ইসলামের স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে সমকামী মানুষের বিরুদ্ধে কথিত ফতোয়া এবং নারীদের বোরকা পরতে বাধ্য করার মতো নির্দেশনার বিরুদ্ধে তিনি একাধিক প্রতিবাদমূলক লেখা প্রকাশ করেন।
আবু সাঈদের অভিযোগ, এসব লেখার পর তাকে ব্লগে লেখালেখি বন্ধ করতে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হয়। ইমেইল, মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও হত্যার হুমকি পাওয়ার দাবি করেছেন তিনি।
তবে হুমকির পরও তিনি ব্লগে লেখালেখি চালিয়ে যান।
সমকামীদের অধিকার ও নারীর স্বাধীনতা নিয়ে লেখালেখি
আবু সাঈদ জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সমকামী মানুষের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রচারিত একটি কথিত ফতোয়ার প্রতিবাদে তিনি ‘ধর্মের অপব্যবহারে মৃত্যুর ফতোয়া: সমকামী মানুষের অধিকার কোথায়?’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন।
পরবর্তী সময়ে তার ছোট ভাইয়ের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ‘আমার ভাইয়ের ওপর হামলা: সমকামী পরিচয়কে কেন্দ্র করে মৌলবাদী সহিংসতার নির্মম চিত্র’ শিরোনামে আরেকটি লেখা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ছাড়া পরিবারের বাড়িতে হামলা এবং স্ত্রীকে বোরকা না পরার কারণে মারধরের অভিযোগ নিয়েও নিজের ব্লগে প্রতিবাদমূলক লেখা প্রকাশ করেন আবু সাঈদ।
তার দাবি, এসব লেখার কারণে ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘প্রেমের স্বাধীনতা’
ব্লগের লেখার পাশাপাশি আবু সাঈদের ‘প্রেমের স্বাধীনতা’ বই নিয়েও আপত্তি ওঠে।
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বইটিতে একজন ছেলে ও মেয়ের প্রেমের সম্পর্কের গল্পের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা, ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাধীনতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
আবু সাঈদের দাবি, বইটি প্রকাশের পর ধর্মীয় গোষ্ঠীর একটি অংশ অভিযোগ তোলে যে এর বিষয়বস্তু তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশায় উৎসাহিত করে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী।
লেখক অবশ্য এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, বইটি কোনো ধর্মকে অবমাননা করার উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি। এটি মূলত প্রেম, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার গল্প।
লেখকের সঙ্গে প্রকাশকও আসামি
আবু সাঈদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের বিরোধের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ১৫ মার্চ তার ও প্রকাশক আরাফাত লাসিনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
একজন লেখকের পাশাপাশি তার প্রকাশককে মামলার আসামি করার বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আবু সাঈদ বলেন, “আমার বই বা ব্লগের বক্তব্য নিয়ে যে কেউ সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু লেখার কারণে লেখক ও প্রকাশক দুজনকেই মামলার মুখোমুখি করা হলে অন্য লেখক ও প্রকাশকদের মধ্যেও ভয় তৈরি হতে পারে।”
তার মতে, কোনো বই নিয়ে আপত্তি থাকলে সেটির সমালোচনা ও বিতর্ক হওয়াই স্বাভাবিক। আইনি ব্যবস্থা বা ভয়ভীতির মাধ্যমে সাহিত্য ও মতামত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা মতপ্রকাশের পরিবেশকে সংকুচিত করতে পারে।
গ্রেপ্তারের পর কারাগারে প্রকাশক
লেখকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলার পর ১৮ মার্চ ২০২৬ প্রকাশক আরাফাত লাসিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন আবু সাঈদ।
প্রকাশকের গ্রেপ্তারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একজন লেখকের বই প্রকাশ করায় প্রকাশককেও যদি ব্যক্তিগতভাবে আইনি ঝুঁকি নিতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রকাশকরা সমালোচনামূলক কিংবা বিতর্কিত বিষয় নিয়ে বই প্রকাশে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আবু সাঈদ
আবু সাঈদ জানিয়েছেন, মামলা দায়েরের সময় তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে আত্মগোপনে ছিলেন। এর আগে নিজের লেখালেখির কারণে একাধিক হুমকি ও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে করা মামলার নিরপেক্ষ বিচার এবং তার ও প্রকাশকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে লেখালেখি ও প্রকাশনার কারণে কোনো ব্যক্তি যেন সহিংসতা বা বেআইনি হুমকির মুখে না পড়েন, সেই নিরাপত্তাও নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
“একটি লেখা বা বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার জবাব আরেকটি লেখা কিংবা যুক্তির মাধ্যমে দেওয়া উচিত। লেখককে ভয় দেখানো বা প্রকাশককে নীরব করার মাধ্যমে নয়,” বলেন আবু সাঈদ।
তবে আবু সাঈদের বিরুদ্ধে মামলার সুনির্দিষ্ট ধারা, মামলার নথি, আরাফাত লাসিনের গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি এবং হেফাযতে ইসলামের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লেখকের তোলা অভিযোগগুলো এই প্রতিবেদনের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, মামলার বাদী বা হেফাযতে ইসলামের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।