নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে দুটি পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী মোঃ ইউসুফ হোসেন, তার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার এবং আরও দুই কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত আইনে মামলা দায়ের করা হয়। পরদিন ১০ এপ্রিল গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে পাঠানো হয়।
তবে ইউসুফ হোসেনের পরিবার পুলিশের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিবারের অভিযোগ, উদ্ধার দেখানো অস্ত্র ও গুলি ইউসুফ বা তার প্রতিষ্ঠানের নয়। স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র ও গুলি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রেখে তাকে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি তাদের।
পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনার পেছনে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি গাজী মনির এবং তার ছেলে আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
ব্যবসা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ইউসুফ হোসেনের বাবা মোঃ বিল্লাল হোসেন সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার একজন দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তিনি রিয়েল এস্টেটের পাশাপাশি রড, সিমেন্ট, বালু, ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
বাবার পাশাপাশি ইউসুফ হোসেনও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি আদমজী ইপিজেড এলাকায় গার্মেন্টস জুট ব্যবসা, গার্মেন্টস শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক খাবার সরবরাহসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জের ১ নম্বর ওয়ার্ডে তাদের পরিবারের মালিকানাধীন দুটি মার্কেট রয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে।
ইউসুফের পরিবারের অভিযোগ, ২০২৬ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা গাজী মনির ও তার ছেলে আশিকুর রহমানের নজর তাদের ব্যবসা ও সম্পত্তির ওপর পড়ে।
একপর্যায়ে গাজী মনির ও তার ছেলের পক্ষ থেকে বিল্লাল হোসেনের কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
চাঁদা দেওয়ার জন্য তাদের এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়। কিন্তু ইউসুফ ও তার বাবা এই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি দখল এবং বাবা-ছেলেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
থানায় অভিযোগের পর বাড়িতে হামলার অভিযোগ
ইউসুফের পরিবারের দাবি, হুমকির পর তারা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ তাদের জিডি গ্রহণ না করে শুধু একটি লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করে।
পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের কাছে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গাজী মনির, তার ছেলে আশিকুর রহমান এবং তাদের সহযোগীরা ইউসুফদের বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ইউসুফের পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা বাড়ির দিকে দুই রাউন্ড গুলি চালায়, পরে বাড়িতে প্রবেশ করে ভাঙচুর করে। এ সময় ইউসুফের বাবা বিল্লাল হোসেনকে মারধর করা হয় এবং লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
পরিবারের দাবি, ঘটনার পরও তারা কার্যকর পুলিশি সুরক্ষা পাননি।
অস্ত্র রেখে ফাঁসানোর অভিযোগ
ইউসুফের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, বাড়িতে হামলার ঘটনার কয়েকদিন পর বিরোধ নতুন মোড় নেয়।
তাদের দাবি, গাজী মনিরের ছেলে আশিকুর রহমান কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে ইউসুফের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যায় এবং সেখানে হট্টগোল সৃষ্টি করে।
পরিবারের অভিযোগ, এ সময় ইউসুফকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দুটি পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি লুকিয়ে রাখা হয়। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের দাবি করে। পরে ব্যবসায়ী ইউসুফ হোসেন, তার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার, যিনি সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই, এবং প্রতিষ্ঠানের আরও দুই কর্মচারীকে আটক করা হয়।
পরবর্তীতে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ
ইউসুফের পরিবারের দাবি, এটি কোনো সাধারণ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা নয়। তাদের সঙ্গে চলমান ব্যবসায়িক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ইউসুফকে ফৌজদারি মামলায় জড়ানো হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে গাজী মনিরের স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং তার ছেলে আশিকুর রহমানের প্রভাবের কারণে তারা প্রশাসনের কাছ থেকেও যথাযথ সহযোগিতা পাচ্ছেন না।
তাদের আরও দাবি, অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার আগে থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে চাঁদা দাবি, ব্যবসা ও সম্পত্তি দখলের হুমকি এবং হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েও তারা নিরাপত্তা পাননি।
ইউসুফের পরিবারের এক সদস্য বলেন, তাদের মূল আশঙ্কা হচ্ছে ব্যবসা ও সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ইউসুফকে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখার চেষ্টা করা হতে পারে।
পরিবারটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। তাদের দাবি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উদ্ধার দেখানো অস্ত্র ও গুলি কীভাবে সেখানে এসেছে এবং ঘটনার আগে ও পরে কারা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
তবে ইউসুফ হোসেনের পরিবারের পক্ষ থেকে গাজী মনির ও আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।